• মঙ্গলবার   ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ ||

  • আশ্বিন ১৪ ১৪২৭

  • || ১২ সফর ১৪৪২

ষাট গম্বুজ বার্তা
২৭১

‘পা দু’টি অচল থাকায় চার বছর শয্যাশায়ী ছিলাম’

ষাট গম্বুজ টাইমস

প্রকাশিত: ২১ আগস্ট ২০২০  

‘মনে হয় প্রতি নিঃশ্বাসে শরীরে থাকা হাজারো স্প্লিন্টার যন্ত্রণা দিচ্ছে। এখনো খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটতে হয়। দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে এ যন্ত্রণা সঙ্গে নিয়ে আমার জীবন কাটছে। দুই পা অচল হওয়ায় চার বছর শয্যাশায়ী ছিলাম। আবার নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে এ পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখতে পারব, তা ভাবিনি। ’ 

‘শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা প্রতিদিনই আমাকে ২১ আগস্টের দুঃসহ স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। প্রতি রাতে ঘুমাতে গেলে শরীরের ব্যথায় ঘুমাতে পারি না। শরীরের দেড় হাজার স্প্লিন্টার আমাকে প্রতি মুহূর্তে কাঁদায়। ’

দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের দুঃসহ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন জাতীয় সংসদের সাবেক সংরক্ষিত মহিলা আসনের সদস্য নাসিমা ফেরদৌসী।  

বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে চালানো সেদিনের গ্রেনেড হামলার দুঃসহ যন্ত্রাণার কথা বলতে বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো ঘরে থাকা সেই দুঃসসহ স্মৃতির ছবি দেখে সময় কাটাই। নিজের ছবি দেখে নিজেকে সামলাতে পারি না অনেক সময়। ’

নাসিমা ফেরদৌসী বলেন, ‘আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য শুরু হওয়ার প্রাক্কালেই গ্রেনেড হামলা শুরু। ডান পাশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বাম পাশে আইভি আপা ছিলেন। কোথাও যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলাম না। মনে হচ্ছিল যেন চারদিকে আগুনের ফুলকি। এরই মধ্যে আমি টের পেয়ে যাই, আমার শরীর জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। আমি, আইভি আপা ও সাবেক মেয়র হানিফ ভাইসহ বেশ কয়েকজন নেত্রীকে জড়িয়ে ধরি। এ সময় মনে হয়েছে, পা শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। শরীর থেকে ঝরছে রক্ত। চারদিকে তাকিয়ে দেখি, সবারই একই অবস্থা। আমি দুই পা দিয়ে আর হাঁটতে পারছি না।

এরপর কোন সময় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি, খেয়াল নেই। অচেতন থাকায় মৃত ভেবে আমাকে তোলা হয়েছিল লাশের ট্রাকে। কিন্তু নড়েচড়ে ওঠার পরে পুলিশ আমাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। ফেলে রাখা হয়, হাসপাতালের করিডোরে। একজন সাংবাদিক এসে আমার কাছে আত্মীয়-স্বজনের মোবাইল ফোন নম্বর চাইলেন। ছেলের মোবাইল নম্বর দেওয়ার পর তিনি তার সঙ্গে যোগোযোগ করলেন।

এরপর আর কিছুই মনে নেই আমার। এরপর আর ওই সাংবাদিকের সঙ্গেও কোনো যোগাযোগ হলো না। ওই সাংবাদিকের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। আজও ওই সাংবাদিককে খুঁজে বেড়াই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞ, তার প্রচেষ্টায় আমি আজ নিজের পায়ে হাঁটতে পারি, পৃথিবীর আলো দেখতে পাচ্ছি। গ্রেনেড হামলাকারীদের বিচার দেখে যেতে পারলে মরেও
শান্তি পেতাম। ’

তিনি আরও বলেন, ‘দুই পা অচল হওয়ায় চার বছর শয্যাশায়ী ছিলাম। চার মাস সারা শরীরে স্পঞ্জ লাগানো ছিল। এরপর হুইল চেয়ার, স্ট্রেচার এবং ওয়াকারের মাধ্যমে হাঁটার চেষ্টা করতাম। দীর্ঘ আট বছর নিজের পায়ে হাঁটতে পারিনি।

আট বছর পর লাঠির সাহায্য নিয়ে হাঁটতে হয়েছে। এখনো স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারি না। এতো যন্ত্রণা, এতো কষ্ট, হাটঁতে কষ্ট, শুতে কষ্ট, এতো অশান্তির মধ্যেও সান্ত্বনা খুঁজে পেয়েছি। মারা গেলে আজ হয়তো অনেক বছর হতো। কীভাবে বেঁচে আছি, তা ভেবে মাঝে মধ্যে অবাক হয়ে যায়। কখনো কখনো ঘরে থাকা সেই দুঃসসহ স্মৃতির ছবি দেখে সময় কাটাই। ’

বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার প্রান্তিক জনপদ বাদুরতলা গ্রামে নাসিমা ফেরদৌসীর জন্ম। সেখানেই কাটে শৈশব আর কৈশর। পারিবারিকভাবেই রাজনীতিতে আসেন তিনি। রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে মানুষের কল্যাণে কাজ করতে তিনিও শুরু করেন আওয়ামী রাজনীতি। তৃণমূল থেকে রাজনীতি শুরু করে রাজধানীতে গিয়েও তিনি রাজনীতি শুরু করেন।

১৯৭৯ সালে মহিলা আওয়ামী লীগের একজন কর্মী হিসেবে দলীয় কাজ শুরু করেন। ১৯৮১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পরে তিনি রাজনীতিতে আরও সক্রিয় হয়ে ওঠেন। রাজপথের লড়াকু সৈনিক হিসেবে অংশ নেন দলের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে। একপর্যায়ে মহিলা আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর (উত্তর) শাখার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

উল্লেখ্য, ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে দলটির এক সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় ২৪ জনের প্রাণহানি হয়। নিহতদের মধ্যে ছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আওয়ামী লীগ নেত্রী আইভি রহমান এবং অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র ও ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ হানিফ। এ হামলায় আহত হন অন্তত তিনশ’ জন। যাদের মধ্যে অনেককেই পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়েছে।  

ষাট গম্বুজ বার্তা
ষাট গম্বুজ বার্তা
জাতীয় বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর