• বুধবার   ২০ জানুয়ারি ২০২১ ||

  • মাঘ ৭ ১৪২৭

  • || ০৬ জমাদিউস সানি ১৪৪২

ষাট গম্বুজ বার্তা
১৬২০

বাবুনগরীর নেতৃত্বেই হত্যা করা হয় আল্লামা শফিকে

ষাট গম্বুজ টাইমস

প্রকাশিত: ২৫ ডিসেম্বর ২০২০  

চট্টগ্রামের আল জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম মাদ্রাসাটি হাটহাজারী মাদ্রাসা নামেই বেশি পরিচিত। মাদ্রাসাটির মহাপরিচালকের দায়িত্বে ছিলেন শাহ আহমদ শফী, যিনি একই সঙ্গে হেফাজতে ইসলামের আমির। এছাড়াও তিনি ছিলেন দেশের বৃহৎ কওমি মাদ্রাসা বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের চেয়ারম্যান। সরকার স্বীকৃত আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামি'আতিল কওমিয়া বাংলাদেশ এর চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। গত ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, দেশের বরেণ্য ইসলামী ব্যক্তিত্ব আল্লামা শাহ আহমদ শফী মারা যান। হেফাজতে ইসলামীর নবগঠিত কমিটি এই মৃত্যুকে স্বাভাবিক দাবি করলেও, আদতে তা কি স্বাভাবিক? ঘটনা পর্যালোচনায় এই মৃত্যু যে 'পরিকল্পিত হত্যা' তা আজ স্পষ্ট। ক্ষমতার লোভে জুনায়েদ বাবু নগরীর নেতৃত্বে হেফাজতে ইসলামীর সন্ত্রাসীদের চরম নৃশংসতার নজির পাওয়া যাবে ঘটনা প্রবাহের দিকে নজর দিলেই।

১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

সেদিন আহমদ শফী সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিলেন, অবস্থান করছিলেন নিজের গড়ে তোলা মাদ্রাসায়। ছেলে আনাস মাদানী ঢাকায় ছিলেন। জোহরের নামাজের পর একজন শিক্ষকের মাধ্যমে আল্লামা শফী জানতে পারেন ছাত্ররা মাঠে চিৎকার করছে, মাদ্রাসার পরিচালনা পর্ষদ থেকে আনাস মাদানীর বহিস্কারের দাবি জানিয়ে জুনায়েদ বাবুনগরীকে উক্ত পদে পুনর্বহাল করতে বলে। কিছুক্ষণ পর খবর আসে, আনাস মাদানীর কক্ষের দরজা-জানালা ভেঙে লুটপাট করছে সন্ত্রাসীরা। আন্দোলনকারী সন্ত্রাসীরা হাটহাজারী মাদরাসার শেখ আহমদ সাহেবের কক্ষের দরজা ভেঙ্গে মুহতামিম সাহেবের কামরায় আসতে বাধ্য করে। ছাত্রদের এই আন্দোলনকে পুঁজি করে উগ্রপন্থী নেতা হাসানুজ্জামানের নেতৃত্বে পাঁচজনের একটি দল মুহতামিম কার্যালয়ে প্রবেশ করেই অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে এবং মাদানীকে বহিষ্কার করার জন্য চাপ প্রয়োগ করে।

 

মাগরিবের পর হাটহাজারী মাদরাসার শুরা সদস্য নোমান ফয়েজী, সালাহউদ্দীন এবং ওমর ফারুকসহ মাদরাসার কয়েকজন শিক্ষক শুরার বৈঠক করেন। বৈঠকে নোমান ফয়েজী ও উগ্রপন্থীরা আনাস মাদানীকে বহিষ্কার করার চাপ দিচ্ছিলেন। এসময় তারা আল্লামা শফির কার্যালয়ের ভেতরে টেবিলের গ্লাস, বাইরের সীমানা গ্লাস এবং ফুলের টবগুলো ভাংচুর করে। এসময় আন্দোলনকারী সন্ত্রাসীদের একটি দল আল্লামা শফির সামনে মাদ্রাসার অফিশিয়াল একটি প্যাড রেখে তার নাতি আরশাদের গলায় গ্লাসের টুকরো ধরে সাক্ষর করতে বলে। একইসময় আল্লামা শফির ব্যক্তিগত সহকারী (খাদেম) মাওলানা শফিউল আলমকে রড দিয়ে আঘাত করা হচ্ছিল। হুজুরকে সরকারের দালাল, মুনাফিক সহ গালিগালাজ করছিল তার খাদেম আর উপস্থিত আলেমদের সামনেই। একপর্যায়ে আল্লামা শফির নাতিকে জিম্মির মাধ্যমে তারা জোরপূর্বক সাক্ষর গ্রহণ করে। এরপর তারা মাদ্রাসার মাঠে গিয়ে মাইকে ঘোষণা দেন- আল্লামা শফি স্বেচ্ছায় আনাস মাদানীকে বহিস্কার করেছেন।

 

১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০

সন্ত্রাসীরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ নানাভাবে গুজব প্রচার করতে থাকে যে, আল্লামা শফী মাদরাসা বন্ধ করে দেওয়ার মিটিং ডেকেছেন, এবং তিনি গতকালকের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন।' এরপর মাদরাসার পাগলা ঘণ্টা বাজানো হয়। এসময় আন্দোলনকারীরা আল্লামা শফীর কার্যালয়ে এসে উপস্থিত শিক্ষকদের বের হয়ে যেতে বলে। উনারা চলে যাওয়ার পর আহমদ শফীর কার্যালয়ের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে ভাংচুর ও লুটতরাজ চালায়। এসময় আল্লামা শফীর খাদেমদের বেধড়ক মারধর করা হয়। অসুস্থ আল্লামা শফীর অক্সিজেন সাপোর্ট খুলে ফেলা হয়। বিদ্যুতের কারণে এসি বন্ধ এবং অক্সিজেন খুলে ফেলায় এসময় আল্লামা শফীর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়। অনেক আকুতি মিনতির পর বিদ্যুৎ সংযোগ ও অক্সিজেন সাপোর্ট দিতে রাজি হয় তারা। অক্সিজেন ও নেবুলাইজারের মাধ্যমে আল্লামা শফীকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে আহত খাদেমরা।

 

দায়মুক্তি

সন্ত্রাসী হামলার পর মূল ঘটনা জানাজানি হবার ভয়ে, সন্ত্রাসীরা পুনরায় আল্লামা শফির নাতি আরশাদকে জিম্মি করে। তারা দাবি করে, মসজিদের মাইকে বলতে হবে যে, আল্লামা শফি সুস্থ আছেন, হামলা হয়নি। এ মর্মে ভিডিওবার্তাও দিতে বলে। তারা দুই পৃষ্ঠার একটি ঘোষণা লিখে নিয়ে আসে। বাধ্য করা হয় ভিডিওবার্তা দেওয়ার জন্য। এসময় আল্লামা শফির নাতি আরশাদকে তার সামনে থেকে টেনে হিঁচড়ে এনে নির্মম নির্যাতন করা হয়। ভাঙচুর করা হয় কামরায় থাকা অনেক আসবাবপত্র। অনেক শিক্ষকের কামরা থেকে তারা টাকা-পয়সা লুটপাট করা হয়, যার অধিকাংশই তাদের ব্যক্তিগত বা বিভিন্ন মসজিদ-মাদরাসায় প্রদান করা অন্যের আমানতের টাকা।

 

আবারো শুরার বৈঠক

মাগরিবের পর বাবু নগরীর নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা আবারো আল্লামা শফির কক্ষে এসে বৈঠক ডাকতে বলেন। সন্ধ্যা সাতটা আটটার দিকে বৈঠক শুরু হওয়ার কয়েক মিনিট পরই অসুস্থ হয়ে পড়েন আল্লামা শফি। হজরতের শরীর ঠান্ডা ও নিথর হয়ে যায়। তার নাতি আরশাদ ও খাদেম মাওলানা শফিউল আলম শুরা সদস্যদের কাকুতি মিনতি করে অনুরোধ করেন, ইমার্জেন্সি হাসপাতালে নিতে। বারবার অনুরোধ করার পরও মিটিং শেষ করতে আধা ঘণ্টা বিলম্ব করায় হজরতের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। কিন্তু শুরা সদস্যদের কেউ আল্লামা শফিকে বের করার জন্য এগিয়ে আসেনি। এসময় কিছু সাদা প্যাড আল্লামা শফির সামনে দিয়ে তার মাথার উপর রড ধরে সন্ত্রাসীরা সাক্ষর করতে চাপ প্রয়োগ করেন।

 

দুই দিনের মানসিক নির্যাতন এবং খাবার ও ওষুধ না পেয়ে হজরত পুরোপুরি অসুস্থ হয়ে বমি করেন, মুখ দিয়ে অনবরত ফেনা বের হচ্ছিল। একসময় চোখ বন্ধ করে ফেলেন শেষবারের মতো। এসময় আল্লামা শফির বড় নাতি সন্ত্রাসীদের সাথে থাকা মাওলানা নোমান ফয়েজীকে বলেন, যেকোন উপায়ে হজরতকে হাসপাতালে নিতে। এসময় তিনি উত্তর দেন, 'আগে তোমার দাদুকে দস্তখত করতে বলো তারপর যা হবার হবে।' তখন নাতি আরশাদসহ খাদেমরা বলেন, ‘দাদুর অবস্থা বেশি খারাপ। আপনারা যা ইচ্ছে করেন।' এরপর সন্ত্রাসীরা হুজুর পদত্যাগ করেছেন মর্মে মাইকে ঘোষণা দেন।

 

হাসপাতালে নেয়া

গুরুতর অসুস্থ আল্লামা শফিকে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসতাপালে নেয়ার পূর্বেও সন্ত্রাসীদের নির্যাতন থামেনি। অ্যাম্বুলেন্স আসার আগে হুজুর সুস্থ আছেন মর্মে মিডিয়ায় একটি ভিডিও প্রচার করার চাপ প্রয়োগ করে সন্ত্রাসীরা। তখন তারা একটি ভিডিও করে এবং সেখানে বলা হয়, হুজুর সুস্থ আছেন এবং ঘুমাচ্ছেন। অথচ তখন হজরতের জীবনপ্রদীপ নিভু নিভু অবস্থায়। হজরত বেহুঁশ ছিলেন, মুখ দিয়ে অনবরত ফেনা বের হচ্ছিল।অ্যাম্বুলেন্স আসার পর আন্দোলনকারীদের একজন এসে বলে, হুজুরের সাথে শুধুমাত্র একজন যেতে পারবে। তখন নাতি ও খাদেম শফিউল বলে, হজরতের সার্বিক দেখভাল করা একজন দ্বারা সম্ভব নয়। কমপক্ষে ৩ জনকে যেতে দিন।

 

অ্যাম্বুলেন্সে বাধা

অ্যাম্বুলেন্স মাদরাসার কবরস্থানের গেট সংলগ্ন বাইতুল আতিক মসজিদের সামনে রাখা হয়। এসময় স্ট্রেচারে নেয়ার সময় হজরতের মুখে লাগানো অক্সিজেন মাস্ক খুলে ছিড়ে ফেলে সন্ত্রাসীরা। এসময় খাদেম হুজাইফা হজরতের সাথে উঠেছিলেন, তাকে টেনে হিঁচড়ে মারধর করে নামিয়ে দেয় সন্ত্রাসীরা। শুধু নাতি আরশাদ একাকী হজরতকে নিয়ে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা করা মাত্র আন্দোলনকারীরা নতুন দাবি নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স আটকে রাখে। 

 

তারা বলতে থাকে- যদি স্থানীয় এমপি ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এই মর্মে স্বাক্ষর না করে যে, ভবিষ্যতে আন্দোলনকারীদের ক্ষতি হবে না, ততক্ষণ অ্যাম্বুলেন্স যেতে দেয়া হবে না। তখন সময় রাত ১১টার উপর। অথচ হজরত স্ট্রোক করেন সাড়ে আটটা থেকে নয়টার দিকে। হজরতের অক্সিজেনের তার ছিঁড়ে ফেলায় অবস্থা আরও গুরুতর পর্যায়ে পৌঁছে যায়। হুজুর একেবারে নিস্তেজ হয়ে পড়েন। ওসি সাহেবের সাথে আন্দোলনকারীদের মিটিং শেষ হলে হজরতের অ্যাম্বুলেন্স ছেড়ে দিতে মসজিদের মাইকে কয়েকবার ঘোষণা দেয়া হয়।

 

রাত ১টা ৩০ মিনিটে হজরতকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা চলতে থাকে। পরদিন ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, দুপুর ১২টায় মারা যান আল্লামা শাহ আহমদ শফী। সম্পূর্ণ ঘটনার আলোকে এটি স্পষ্ট প্রতীয়মান যে, এটা স্বাভাবিক মৃত্যু নয় বরং পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

ষাট গম্বুজ বার্তা
ষাট গম্বুজ বার্তা
জাতীয় বিভাগের পাঠকপ্রিয় খবর