• সোমবার ১৫ জুলাই ২০২৪ ||

  • আষাঢ় ৩১ ১৪৩১

  • || ০৭ মুহররম ১৪৪৬

ষাট গম্বুজ বার্তা

৩৫ বছর শেকলে বাঁধা জীবন!

ষাট গম্বুজ টাইমস

প্রকাশিত: ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০  

তিন যুগ ধরে শেকলবন্দি রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার ভেন্ডাবাড়ীর গোলাম মওলা। বাড়ির পাশের ঝোপে ছোট্ট টিনের ছাপড়ায় কৈশোর-যৌবন, আর অসংখ্য শীত-বর্ষা কাটিয়ে এখন জীবনের শেষবেলা তার। ছাড়া পেলেই সে হিংস্র হয়ে ওঠে, তাই মানসিক বিকারগ্রস্ত লোকটিকে শেকলে বেঁধে রেখে দায়িত্ব শেষ করেছেন সবাই।
মূলবাড়ির ভেতরে টানা-টানা লম্বা দুটি দোচালা ঘরে পার্টিশন দেয়া খোপ খোপ ঘরগুলোতে বাস করে চার ভাইয়ের পরিবার। মাটি-লেপা পরিচ্ছন্ন বড় উঠানের পশ্চিমে গাছ-গাছড়ার ঝাড়-জঙ্গল। মাথার সিঁথির মতো মেঠো পথ ধরে এগিয়ে যেতেই পায়ে বাঁধা শেকল ধরে প্রাণপণ টানাটানি করতে দেখা গেলো মধ্যবয়স পেরুনো লোকটিকে। শেকলের আরেকটি প্রান্ত বাঁধা মোটা গাছের সঙ্গে। শিকল ছিড়ে মুক্ত হওয়ার প্রাণান্ত চেষ্টা তার সফল হয়নি ৩৫ বছর ধরে। শেকলের বৃত্তের ভেতরই প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে হয় তাকে, সেখানেই তার আহার-নিদ্রা। তার কাছাকাছি যায় না কেউ। দূর থেকে লম্বা লাঠি দিয়ে ঠেলে দেয়া হয় ভাতের থালা।   

সরেজমিনে দেখতে গিয়েছিলেন সময় টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিবেদক রতন সরকার। শোনা যাক তার মুখ থেকেই। 

সাহস করে কাছে গেলাম। হাত বাড়িয়ে দিতে হ্যান্ডশেক করেন শেকলবন্দী গোলাম মওলা। কেমন আছেন? জানতে চাওয়ায় বিড়বিড়িয়ে শুধু বললেন, চেয়ারম্যানে বান্ধি থুছে …।



পরিবারের সদস্যরা বলেন, সুযোগ পেলেই সামনে যা পান তা নিয়ে তাড়া করেন। প্রাণ বাঁচাতে দৌড়ে পালায় লোকজন। তার হাতে আহত হয়েছেন অনেকে। যাদের মধ্যে পরিবারের দুই নারীও আছেন। তার হাত থেকে রক্ষা পায় না গরু ছাগলও। গরু ধরে লেজ কাটা, ছাগলের পা কাটা, ডানা ধরে হাঁস-মুরগী ছিঁড়ে ফেলা ছিলো তার প্রতিদিনের কাজ। তাই বাধ্য হয়েই বেঁধে রাখার সিদ্ধান্ত নিতে হয় বলে জানায় পরিবারের সদস্যরা।
 

মানবাধিকারকর্মী ও পাবলিক প্রসিকিউটর জাহাঙ্গীর হোসেন তুহিন বিষয়টিকে মৌলিক অধিকার পরিপন্থী দাবি করে বলেন, মানসিক বিকারগ্রস্ত এই মানুষটি সুচিকিৎসার দাবি রাখেন। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থানসহ মৌলিক অধিকার থেকেও তিনি বঞ্চিত হচ্ছেন বলেও মনে করেন তিনি।

তুহিন বলেন, সংবিধান স্বীকৃতভাবেই রাষ্ট্রের দায় আছে তার প্রতি। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও ব্যক্তিরা এ ব্যাপারে কোন রকম উদ্যোগ গ্রহণে ব্যর্থ হলে তাকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে বলে জানান তিনি।

পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছে, পুলিশ-জনপ্রতিনিধি-হাসপাতালসহ সবখানেই ধর্ণা দিয়েও প্রতিকার সমাধান পাননি। পীরগঞ্জ থানার তৎকালীন এক ইনচার্জের নির্দেশেই কম-বেশি ৩৫ বছর ধরে বন্দী বা শেকল বাঁধা অবস্থায় রাখা হয়েছে তাকে। আর টানা ২১ বছর একই স্থানে শেকলে বাঁধা আছেন মওলা।

পীরগঞ্জ থানার বর্তমান পরিদর্শক  ‍সুরেশ কুমার সরকার গোলাম মওলার খবর জানেন বলে স্বীকার করেন। কিন্তু ব্যবস্থা গ্রহণ সম্পর্কে জানতে চাইলে সদুত্তর পাওয়া যায়নি তার কাছে থেকে।

তবে মাস কয়েক আগে রংপুর জেলার পুলিশ সুপারের পদে যোগ দেয়া বিপ্লব কুমার সরকার অবশ্য বলেছেন, বিষয়টি তার জানা ছিলো না। তবে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি।

ষাট গম্বুজ বার্তা
ষাট গম্বুজ বার্তা