• বৃহস্পতিবার ২০ জুন ২০২৪ ||

  • আষাঢ় ৬ ১৪৩১

  • || ১২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

ষাট গম্বুজ বার্তা

‘পাগল’ শব্দটাই মূল সমস্যা

ষাট গম্বুজ টাইমস

প্রকাশিত: ১২ অক্টোবর ২০২৩  

১০ বছরের রাদিম (ছদ্মনাম) ক্লাসে মনোযোগ দেয় না। স্কুল থেকে অভিভাবকদের জানানো হয়—তার মধ্যে কিছু ‘অস্বাভাবিক’ বিষয় লক্ষ করেছেন শিক্ষকরা। ক্লাসে তার আচরণের এই ভিন্নতা অন্য শিক্ষার্থীদের ওপরে প্রভাব ফেলছে। অন্য শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা কর্তৃপক্ষকে জানায়, রাদিমের ‘পাগলামো’ তাদের শিশুদের বিকাশে প্রভাব ফেলার শঙ্কা করছেন তারা। রাদিমের মায়ের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করতে গেলে তিনি সরাসরি বলেন, রাদিম ‘পাগল’ না। তার বাচ্চাকে ‘পাগল’ বলেছে ভেবে তিনি নিজেও ডিপ্রেশনে চলে যান।

মনোচিকিৎসকরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়টি এখনও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ হতে না পারার অন্যতম কারণ এই ‘পাগল’ শব্দটি। এই শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে সমাজে এক ধরনের ইমেজ প্রতিষ্ঠিত হয় বলে স্বাভাবিক মানসিক সমস্যাগুলো নিয়েও চিকিৎসকদের কাছে যেতে চান না অভিভাবকরা।

বাংলাদেশে গ্রাম বা শহরে এরকম বহু নারী-পুরুষ আছেন, যারা কমবেশি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। আচরণগত পার্থক্যের কারণে পরিবার, সমাজ তাদের ভুল বুঝে এবং প্রায় একঘরে করে ফেলে। পরিবারের ভেতরে থাকার মধ্য দিয়ে যে সমস্যা অনেক সহজে সমাধান হতে পারে, বিচ্ছিন্ন করে ফেলার কারণে তা বেড়ে যায় কয়েকগুণ। মানসিক সমস্যাকে আমাদের মতো দেশে কোনও সমস্যা হিসেবে মনেই করা হয় না। শারীরিক সমস্যাকে যতটুকু গুরুত্ব দেওয়া হয়, মানসিক সমস্যাকে এর এক শতাংশও গুরুত্ব দেওয়া হয় না।

চিকিৎসকরা বলেছেন, এই যে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতা, তার প্রমাণ মেলে যখন কিনা দেশের চার কোটি মানুষ মানসিক সমস্যায় ভুগছে জেনেও স্বাস্থ্য খাতে মোট ব্যয়ের মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয় হয় মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য। অর্থাৎ ১০০ টাকা খরচ হলে মানসিক স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় হয় মাত্র ৫০ পয়সা। অথচ দেশে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে ১৯ শতাংশ ও অপ্রাপ্তবয়স্কদের ১৩ শতাংশ কোনও না কোনও মানসিক রোগে আক্রান্ত।

আমাদের দেশে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বেশ কিছু স্টিগমা রয়েছে। যা দেশের মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পথে প্রধান অন্তরায়। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় মানসিক রোগীকে পাগল হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। ফলে চিকিৎসকের কাছেও যেতে চায় না কেউ।

‘মানসিক রোগের ক্ষেত্রে সমাজে বেশ কিছু স্টিগমা রয়েছে’ উল্লেখ করে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এ বিষয়ে সমাজে লোকলজ্জার বিষয় রয়েছে। এসব কারণে কেউ নিজেকে মানসিক রোগী হিসেবে প্রকাশ করতে চায় না। ফলে যারা শেষমেশ চিকিৎসকের কাছে আসেন, তারাও লুকিয়ে আসেন। কারণ, তাদের ভয় পরিবারের কাছের লোকজনও পাগল বলবে। এটি মানসিক রোগীদের চিহ্নিত করা ও চিকিৎসার আওতায় আনার ক্ষেত্রে একটি বড় বাধা।’

এ পরিস্থিতি থেকে বের হতে চাইলে গণমাধ্যমের ভূমিকা অন্যতম উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই যে রোগী চিকিৎসকের প্রয়োজনীয়তা লুকিয়ে রাখে, সে কারণে তার রোগ বাড়ে। এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া হিসেবে অনেকে সহ্য করতে না পেয়ে আত্মহত্যা পর্যন্ত করে। পুরো বিষয়টি নিয়ে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মানসিক স্বাস্থ্য মানেই যে কাউকে পাগল সাব্যস্ত করা যাবে না। শরীরে নানা রোগের মতোই এটা যে সেরে ওঠার মতো একটা রোগ, সেটা নিয়ে বেশি বেশি বলতে হবে।’

সামাজিক চাপে পড়ে পরিস্থিতি অস্বীকার করার যে প্রবণতা, সেটার কারণে মানসিক রোগী দিন দিন বাড়ছে উল্লেখ করে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অভ্র দাস ভৌমিক বলেন, ‘এই ইনস্টিটিউটের আউটডোরে রোগী দেখার সুব্যবস্থা আছে। এখানে এসে অনেকে যখন কিছু গুরুত্বপূর্ণ মানসিক রোগী দেখেন, তখন তাদের সঙ্গে নিজের রোগীর অবস্থা মিলিয়ে ভাবেন ‘আমার রোগী তো এমন পাগল না’, বা ‘আমার রোগী এ রকম আচরণ করে না’। তখন তারা রোগীর চিকিৎসা না করিয়ে ফিরে যান। ফলে যে সময় তার রোগীর চিকিৎসা দরকার ছিল, ওই সময় সে সেই সেবা পায় না এবং তার রোগ বাড়তে থাকে। রোগকে অস্বীকার করার এই প্রবণতা কমিয়ে আনতে আমাদের কাজ করতে হবে।’

ষাট গম্বুজ বার্তা
ষাট গম্বুজ বার্তা