• বৃহস্পতিবার ২০ জুন ২০২৪ ||

  • আষাঢ় ৬ ১৪৩১

  • || ১২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

ষাট গম্বুজ বার্তা

এভাবে চলতে পারে না, এই উপলব্ধি আসতে হবে : জামিলুর রেজা চৌধুরী

ষাট গম্বুজ টাইমস

প্রকাশিত: ৬ নভেম্বর ২০১৯  

 প্রায় ৭০ বছর ধরে আপনি ঢাকায় বসবাস করছেন। এ শহর ছেড়েও যাচ্ছেন না, আবার বৈশ্বিক বসবাস উপযোগিতার সূচকে এটা অন্যতম নিকৃষ্ট একটি শহর। এ বিষয়ে আপনার মতামত কী?

জামিলুর রেজা চৌধুরী: ১৯৫২ সালে আমরা যখন ঢাকায় আসি, তখন ছিল এটা প্রাদেশিক রাজধানী। জনসংখ্যা তিন লাখের মতো। যদিও কিছু সমস্যা তখনো ছিল, কিন্তু বসবাসের দিক থেকে শা‌ন্তিপূর্ণ একটা পরিবেশ ছিল। ঢাকার অলিগলি আমি ছোটবেলায় হেঁটে বেড়িয়েছি। এই দীর্ঘ ৬৭ বছরে চারবার বাড়ি বদল করে এখন এই ধানমন্ডিতে থাকছি। এর মধ্যে ৬১ বছরই কেটেছে এলিফ্যান্ট রোডে একটি বাসায়, যেটা আমার আব্বা নির্মাণ করেছিলেন ১৯৫৪ সালে ধানখেতের মাঝখানে, অনেকটা গ্রামীণ পরিবেশে। আমার চোখের সামনে দিয়ে একটা পরিচ্ছন্ন নগরকে বসবাসের প্রায় অযোগ্য মহানগরে পরিণত হতে দেখলাম। আমার কাছে মনে হয়, এই ঢাকা এখন জনসাধারণের চলাচলের জন্য সবচেয়ে বিপৎসংকুল মহানগরীর অন্যতম।

 কেন এমন হলো বলে আপনার মনে হয়?

জামিলুর রেজা চৌধুরী: ঢাকা শহরে স্বচ্ছন্দে চলাচলের কোনো উপায় নেই। আমরা গাড়িতে বসে ঘণ্টায় মাত্র পাঁচ-ছয় কিলোমিটার চলতে পারি, কিন্তু এটা তো শহরের চরিত্র হতে পারে না। আমাদের নগর–পরিকল্পনায় ও যোগাযোগব্যবস্থা পরিকল্পনায় পায়ে হাঁটা পথকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সেটাও বাস্তবায়িত হয় না। ফুটপাত বেদখল হয়ে যায়। পথচারীরা ব্যবহার করতে পারে না। এসব

বিবেচনায় ঢাকা একটা বিপজ্জনক মহানগরী বলেই মনে হয়। ১৯৫০–এর দশকের শেষের দিকে যে মাস্টারপ্ল্যান করা হয়, এটা ছিল একটা প্রদেশের রাজধানীর জন্য সর্বোচ্চ ২০ লাখ লোকের কথা বিবেচনা করে। কিন্তু ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে ঢাকা যখন একটি দেশের রাজধানী হয়ে গেল এবং খুব দ্রুতগতিতে জনসংখ্যা বাড়তে লাগল, তখন প্রয়োজন পড়ল নতুন করে নগর–পরিকল্পনার। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমাদের সরকার সঠিক সময়ে সিদ্ধান্ত না নেওয়ায় অপরিকল্পিত নগর হিসেবে ঢাকা গড়ে ওঠে। এরপর ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে ইউএনডিপির আর্থিক সহায়তায় ঢাকা মহানগরী উন্নয়ন পরিকল্পনা (ডিএমডিপি) প্রণয়ন করা হয়। বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসে এটি প্রস্তুত করে দিয়ে যায়। তাতে ছিল স্ট্রাকচার প্ল্যান ও আরবান এরিয়া প্ল্যান (১৯৯৫-২০১৫)। তারা সুপারিশ করে এর ওপর ভিত্তি করে পাঁচ বছরের মধ্যে ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) প্রণয়ন করতে হবে।কিন্তু ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) করার উদ্যোগ নিতে নিতে ২০০৪ সাল হয়ে যায়। তখন চারটি দেশীয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠানকে ভাগ করে চার এলাকায় কাজটি দেওয়া হয়, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত তাদের কাজের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় ছিল না। এই অসামঞ্জস্য দূর করার লক্ষ্যে ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ দিকে আমাকে চেয়ারম্যান করে একটা কমিটি করা হয়, যাঁদের দায়িত্ব ছিল পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রস্তুত করা, পরিকল্পনা ও সুপারিশমালা পর্যালোচনা করে সরকারকে একটা রিপোর্ট দেওয়া। তিন মাসের মধ্যে আমরা যে সুপারিশ জমা দিলাম, তার মধ্যে আমাদের অন্যতম সুপারিশ ছিল যে ‘ফ্লাড ফ্লো জোন’ ছাড়াও ‘সাবফ্লাড ফ্লো জোন’–এ পানির গতি রোধ করতে পারে, এমন কিছু স্থাপনা থাকতে পারবে না, যাতে নিচ দিয়ে পানির প্রবাহটা নিশ্চিত থাকে। এটা করতে গিয়ে দেখলাম যে রাজউকই অনেক জায়গায় এই সব ফ্লাড ফ্লো জোন দখল করে সেখানে হাউজিং প্রকল্প করে ফেলছে। রাজউক নিজে যেখানে ডেভেলপ করে, সেখানে কারও অনুমতি নেয় না। অর্থাৎ তারাই ডেভেলপার আর একই সঙ্গে তারাই অনুমোদনকারী সংস্থা বা রেগুলেটর—পরিষ্কারভাবে এটা স্বার্থের সংঘাত।

 রাজউক কী করে এসব জায়গায় তাদের স্থাপনা করে?

জামিলুর রেজা চৌধুরী: রাজউক ছাড়াও আমরা বেশ কটি শক্তিশালী সরকারি ও বেসরকারি সংস্থার প্রাইভেট হাউজিংয়ের অনুমোদন বাতিল করার সুপারিশ করেছিলাম, কিন্তু তারা আবার মন্ত্রণালয়ে লবিং করে। ফলে নতুন কমিটি তৈরি করা হলো এই রিভিউর ওপর রিভিউ করার জন্য। তারপরও শেষ পর্যন্ত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর নিয়ে আমাদের সুপারিশের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা DAP সরকারি গেজেট ২০১০ সালের ২০ জুন প্রকাশিত হলো। কিন্তু এর চার–পাঁচ দিন পর আবার একটা গেজেট বের হলো, সেখানে ড্যাপের রিভিউ করার জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি করা হলো, যেখানে পাঁচ-ছয়জন মন্ত্রী ছিলেন। এটা খুবই বিব্রতকর একটা অবস্থা ছিল। একদিকে বলা হচ্ছে ড্যাপ অনুমোদিত, আরেক দিকে সমান্তরালভাবে রিভিউ করার জন্য প্রভাবশালী মহল চাপ দিচ্ছে।

 এখানে রাজউকের অবস্থা কী ছিল?

জামিলুর রেজা চৌধুরী: রাজউক কিন্তু গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে। এখন মন্ত্রী যদি নির্দেশ দেন এটা করেন, তারা করে ফেলে। তাদের হয়তো দ্বিমত ব্যক্ত করার সুযোগ আছে, ক্ষমতা আছে, কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন—তারা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশেই চলে।

 তাহলে যদি মন্ত্রণালয় থেকেই বলে দেওয়া হয় যে এখানে বাড়ি করবে, এখানে স্কুল হবে, এখানে একটি ইউনিভার্সিটি হবে, তাহলে আপনাদের দিয়ে কেন ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যান করানো হলো?

জামিলুর রেজা চৌধুরী: আমার কাছে এর কোনো ব্যাখ্যা নেই। ২০১১ সালে একবার মাননীয় প্রতিমন্ত্রী ল্যান্ড ডেভেলপারদের বলেছিলেন, ‘আপনারা ভূমিদস্যুরা রাত্রে ঘুমান কীভাবে?’ তার কিছুদিন পর দেখি তিনি অবস্থান পরিবর্তন করেছেন। আমরা বলেছিলাম, বেআইনিভাবে যেগুলোতে মাটি ভরাট করা হয়েছে, কোনো দালান বানানো হয়নি, সেগুলোতে মাটিটা সরিয়ে ফেললেই হয়। পেশায় আইনজীবী মাননীয় প্রতিমন্ত্রী বললেন, ‘আমাদের আইনে একটা কথা আছে যে একটা অবৈধ শিশু যদি জন্মগ্রহণ করে, তার বেঁচে থাকার অধিকার আছে, তাকে বেঁচে থাকার সুযোগ দিতে হবে।’ তারপর তো আর এই ড্যাপের বাস্তবায়ন হলো না। ল্যান্ড ডেভেলপারস আর এক্সট্রিমলি পাওয়ারফুল। এদের বিরুদ্ধে কথা বললে জীবনের নিরাপত্তাও বিঘ্নিত হতে পারে।

 আবার ইমারত নির্মাণকারী ডেভেলপাররাও একভাবে প্ল্যান পাস করায়, নির্মাণ করে আরেকভাবে, এটা তো রাজউকেরই দেখার কথা।

জামিলুর রেজা চৌধুরী: একটা ভবন নির্মাণের আবেদনের পর থেকে ইউটিলিটি কানেশনের আগে পর্যন্ত চার স্তরে পর্যবেক্ষণ করে রাজউকের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট দেওয়ার কথা। ২০১৩ সালে রানা প্লাজার ঘটনার পর রাজউক একটা তালিকা দিয়েছিল যে তখন পর্যন্ত তারা ঢাকায় মাত্র ১৮টি বিল্ডিংয়ের অকুপেন্সি সার্টিফিকেট দিয়েছিল। অর্থাৎ আইন বা বিধি আছে, কিন্তু মানা হয় না। বর্তমানের ইমারত নির্মাণ বিধিমালায়ও নিয়ন্ত্রণের অনেক কথা লেখা আছে, কিন্তু এগুলো কেউ দেখেটেখে না। রাজউকে এখন যে জনবল আছে, তাতে ঢাকা মহানগরের যে এত বিল্ডিং হচ্ছে, এগুলোর প্রতিটি নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা তাদের নেই।

 স্যার, আপনি কি মনে করেন যে শুধুই জনবলের অভাব?

জামিলুর রেজা চৌধুরী: জনবলের অভাব একটা অজুহাত, এটা দেখিয়ে তারা কিছুই করে না। রাজউক যেহেতু এটা করতে পারবে না, প্রায় চার বছর আগে আমরা রাজউকের নিয়োগ করা একটি কমিটি থেকে আরেকটা সুপারিশ করেছিলাম যে রাজউক এটা আউটসোর্সিং করবে। বাইরের কোয়ালিফাইড কনসালটিং ফার্ম দিয়ে এই কাজ করাবে এবং কনসালট্যান্টরা রাজউক থেকে এর জন্য ফি পাবে, যে ফি রাজউকই আবেদকারীর কাছ থেকে অনুমোদনের সময় আদায় করবে।

 আউটসোর্সিং করে বাইরে থেকে কনসালটিং ফার্ম নিয়োগ করে দিলেই কি মনে করেন যে বিল্ডিং নির্মাণগুলো অ্যাকুরেট হবে?

জামিলুর রেজা চৌধুরী: একবারেই সব হবে না। তবে বর্তমান অবস্থা থেকে অনেক উন্নতি হবে।

 আমাদের যেসব নীতিমালা আছে, সেগুলোরই তো যথাযথ প্রয়োগ নেই।

জামিলুর রেজা চৌধুরী: এর একটা কারণ, যাঁদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এই নীতিমালা বাস্তবায়নের, তাঁদের অক্ষমতা। আরেকটা হলো যে টাকাপয়সা বা ক্ষমতার বিনিময়ে যেকোনো কিছুর অনুমোদন আনা যায়।

 স্যার, এভাবে কত দিন চলবে?

জামিলুর রেজা চৌধুরী: বলা যাচ্ছে না কত দিন চলবে, তবে যদি এমন সরকার পাই, যারা সত্যিকার অর্থে এগুলো বাস্তবায়নের ব্যাপারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, তখন হবে।

 আপনি কি মনে করেছেন নতুন কাউকে এসে আমাদের এটা করতে হবে, নাকি পুরোনো যারা আছে, তাদের দিয়ে এটা হবে?

জামিলুর রেজা চৌধুরী: না, আশা করি এদের মধ্যেই একটা উপলব্ধি আসবে যে এভাবে চলতে পারে না।

 কিন্তু যিনি ঘুষ খেয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছেন, তাঁকে তো আপনি ঘুষ থেকে সরাতে পারবেন না।

জামিলুর রেজা চৌধুরী: যাঁরা শক্ত হাতে এই পদক্ষেপগুলো নেবেন এবং কোনো অবস্থায় কোনো রকম ছাড় দেওয়া হবে না, এমন কিছু করতে হবে। সম্প্রতি কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে, কিন্তু এগুলো কত দিন চলবে, আমি জানি না। বিধিমালা না মানা যে শাস্তিযোগ্য অপরাধ, এর প্রয়োগ হওয়া দরকার।

 আমাদের দেশের ভূমি উন্নয়ন বা ইমারত নির্মাণের এ বিধিমালা আছে, তা যেকোনো উন্নত দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কিন্তু আমাদের দেশে এই সব বিধিমালার প্রয়োগের বিষয়ে আপনার মতামত জানতে চাই।

জামিলুর রেজা চৌধুরী: নতুন ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড, যেটা সম্প্রতি চূড়ান্ত করা হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশ বিল্ডিং রেগুলেটরি অথরিটি নামে একটি নতুন সংস্থার গঠন ও দায়িত্ব সম্পর্কে উল্লেখ আছে। যেই সংস্থার গঠনের কথা মহামান্য হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন সরকারকে, যার একমাত্র দায়িত্ব হবে সারা দেশে এই কোড ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা বাস্তবায়ন করা। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের দেশের বিচারব্যবস্থাও দুর্নীতিগ্রস্ত হচ্ছে, এই অভিযোগ সরকার থেকেই আসছে। গ্রিক বিচারের দেবী থেমিসের দুই চোখ বাঁধা থাকে। এর কারণ, যে বিচারক রায় দেবেন, তিনি কাউকে না দেখেই দেবেন।

ষাট গম্বুজ বার্তা
ষাট গম্বুজ বার্তা