• বৃহস্পতিবার ২০ জুন ২০২৪ ||

  • আষাঢ় ৬ ১৪৩১

  • || ১২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

ষাট গম্বুজ বার্তা

সবার জন্য আইনের সমান প্রয়োগ জরুরি

ষাট গম্বুজ টাইমস

প্রকাশিত: ৯ ডিসেম্বর ২০১৯  

এক. একসময় রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে মোটরসাইকেল আরোহী ও সঙ্গীরা প্রতিনিয়ত হেলমেট ছাড়া যাতায়াত করতেন। গত কয়েকমাস যাবত দেখা যাচ্ছে মোটরসাইকেল আরোহীই শুধু নয়, সঙ্গী আরোহীও হেলমেট মাথায় রাখছেন। তিনজন বা পুরো পরিবারসহ বাইকে যাতায়াত প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

দুই. প্রাইভেটকার বা গড়িতে সিটবেল্ট বাঁধতেন না গাড়িচালক বা সামনের আসনে বসা যাত্রী। আজ প্রায় গাড়িতেই সিটবেল্ট বেঁধে গাড়ি চালান চালক, সামনের যাত্রীও সিটবেল্ট বাঁধেন।

তিন. গণপরিবহনে নির্বিচারে ধূমপান করতেন যাত্রীদের একাংশ। আজ গণপরিবহনে ধূমপান করেন না কোনো যাত্রী। এমনকি যাত্রাপথে অনেক যাত্রী ধূমপানের অভ্যাসটি ঝালাই করেন না পাশে থাকা যাত্রীর প্রতি সম্মান জানিয়ে।

এই তিনটি উদাহরণ দিলাম এই জন্য যে, এগুলো নিয়ে ভাবলে অনেকেই বাংলাদেশের সমস্যা-সংকটের একটি চিত্র দাঁড় করিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করতে পারবেন। এই যে পরিবর্তন তা কিন্তু হয়েছে সচেতনতা সৃষ্টিতে প্রচারণা এবং আইনের কঠোরতার কারণে। দেশের মানুষের এই মনোজাগতিক পরিবর্তন আজ লক্ষ্য করার মতো। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের মাঝে এই পরিবর্তনের হার আগের চেয়ে বেড়েছে। কিন্তু সংকটটা তথাকথিত ‘অসাধারণ’র মধ্যে। যারা মনে করেন আইনি বা বেআইনিভাবে দেশ ও পৃথিবীর সব সুযোগ-সুবিধা তারা আয়ত্তে নেয়ার ক্ষমতা ও অধিকার রাখেন।

বাংলাদেশের জনগণের অতীত বা বর্তমানের চুলচেরা পর্যালোচনা করলে এটা স্পষ্ট হবে যে, সাধারণ মানুষ আইন মানতে চায়, মেনে চলে। সচেতনতা সৃষ্টির আহ্বানকেও তারা উপেক্ষা করে না। মানবতা ও সমাজজীবনে সাধারণ জনগণের কর্মকাণ্ড উদ্দীপনামূলক। কিন্তু যারা ‘অসাধারণ’ তারা আইন-বিচার, কৃষ্টি-সংস্কৃতি কতটা মানেন সেটা একবার চোখ বন্ধ করে ভাবলেই স্পষ্ট হয়ে যায়।

আমার দেশের কোন সাধারণ মানুষটি নদী দখল করে আবাসিক এলাকা তৈরি করেছেন? কোন সাধারণ মানুষটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়তে বা নিজের বাণিজ্যিক-আবাসিক ভবনের জন্য সরকারি বা অন্যের জায়গা দখল করেছেন? কোন সাধারণ মানুষটি ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে তা যথাসময়ে ফেরত দেননি? অথবা শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে কোন সাধারণ মানুষের জন্য? কোন সাধারণ মানুষটি অনৈতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাষ্ট্র বা সমাজের ক্ষতিসাধন করেছেন?

দেশে আইন ভাঙার যে অপসংস্কৃতির কথা আমরা শুনতে পাই বা জানতে পারি তা কিন্তু সাধারণ কেউই করেন না বরং আইনপ্রণেতা, আইনের রক্ষক বা আইন প্রয়োগকারীরাই আইনকে বৃদ্ধাঙুলি দেখান, তুচ্ছাতিতুচ্ছ করেন। বাংলাদেশের কোনো কৃষক-শ্রমিক-মজুর বা জেলে ব্যাংক থেকে সহজে লোন নেন না, নিলেও তারা তা সময়মতো পরিশোধ করেন। আর কোনো কারণে ঋণের অল্প টাকাটি সময়মতো পরিশোধ করতে না পারলে সাধারণ মানুষটির কোমরে দড়ি পড়ে। কিন্তু যারা বড় বড় খেলাপি তাদের কোমরে ক’বার দড়ি পড়েছে? ক’বার আইনের মুখোমুখি হতে হয়েছে এ ধরনের ঋণখেলাপিদের?

সাধারণ মানুষটি নদীরক্ষার জন্য আন্দোলন করেন। বৃক্ষসৃজন করেন। বৃক্ষ ও পরিবেশ বাঁচাতে সরকার বা রাষ্ট্রের সঙ্গে একাট্টা হয়ে কাজ করেন। আর ‘অসাধারণ’ মানুষটি নদী দখল করেন, বৃক্ষনিধন করেন। আইনের ফাঁক গলিয়ে রাষ্ট্রকে বৃদ্ধাঙুলি দেখান অথবা আইন তার কাছে অসহায় আত্মসমর্পণ করে। সাধারণ মানুষ শেয়ারবাজারে পুঁজি খাটান বা বিনিয়োগ করেন আইনের ওপর ভরসা করে। আর ‘অসাধারণ’ মানুষটি আইনকে তুচ্ছ করে আইনি সকল প্রতিষ্ঠানকে উপেক্ষা করে অথবা তাদের ফেভার নিয়ে শেয়ারবাজার গিলে ফেলেন।

সাধারণ মানুষটি ব্যাংকে তার সর্বস্ব জমা রাখলেও আয়কর বিভাগ সেখান থেকে কর কেটে নেয়, আর ‘অসাধারণ’ মানুষটি বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকা আয়কর ফাঁকি দিয়ে বহাল তবিয়তে আছেন। সাধারণ মানুষটি তার শ্রম-ঘামের মজুরি ঠিকমতো পান না বা আদায় করতে ব্যর্থ হন। আর ‘অসাধারণ’ মানুষটি শ্রমিকের ন্যায্য পাওনা না দিয়েও রাষ্ট্রের সম্মান পেয়ে যাচ্ছেন।

আমার দেশের সাধারণ মানুষ অনেক বেশি সহনশীল ও দেশপ্রেমিক। মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্তের মানুষজন সহজে কারও অর্থসম্পদ লুট করার প্রবণতা রাখেন না। কিন্তু সমাজের বিত্তশালী বা তথাকথিত উচ্চবিত্তরা এ কাজটি হরহামেশা করছেন। এর সবই তথাকথিত অসাধারণ মানুষজন করছেন। কিন্তু দায় বহন করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষটিকে।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসা আজ অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। আইনের প্রয়োগ বা ব্যবহার সাধারণ-অসাধারণ সবার জন্য সমান হওয়া উচিত। ঋণখেলাপির জন্য ঋণ পরিশোধের সুবিধা বাড়ানোর বদলে তার ঋণগ্রস্ত সম্পত্তি শর্তসাপেক্ষে রাষ্ট্রের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। সময় এখন দিনবদলের। সময় এখন শুদ্ধতার দৃষ্টান্ত স্থাপনের। সে জন্য সাধারণ মানুষটিকে তার সততা, একাগ্রতা ও ন্যায়নিষ্ঠতার জন্য সম্মান জানাতে হবে। আর ক্ষতিকারক ‘অসাধারণ’ মানুষটির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

ষাট গম্বুজ বার্তা
ষাট গম্বুজ বার্তা