• বৃহস্পতিবার ২০ জুন ২০২৪ ||

  • আষাঢ় ৬ ১৪৩১

  • || ১২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৫

ষাট গম্বুজ বার্তা

দেশের প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী

ষাট গম্বুজ টাইমস

প্রকাশিত: ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯  

তখন ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাস। স্থানীয় প্রশাসনের জারি করা ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে সেদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে বিক্ষোভে নামেন প্রায় ২ হাজার শিক্ষার্থী। উত্তেজনাপূর্ণ এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের উপর গুলির আদেশ করেন পাকসেনারা। ‘ডোন্ট ফায়ার’ বলতে বলতে শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে বুক পেতে দিয়ে শহীদ হলেন অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহা। দেশের ইতিহাসে তিনিই প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা তখন রাবি প্রক্টর। শিক্ষকজীবনেও তিনি ছিলেন জনপ্রিয় একজন। শিক্ষার্থীদের কাছে পরিচিত ছিলেন ‘জোহা স্যার’ নামে। শিক্ষা ও সহ-শিক্ষা উভয় কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতেন। তাদের সুখে-দুঃখে সবসময় এগিয়ে আসতেন সবার আগে। দেশের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারী শিক্ষার্থীদের জন্য আত্মত্যাগে স্মরণীয় হয়ে আছেন তিনি।

ঘটনার সূত্রপাত ১৫ ফেব্রুয়ারি। এদিন নিরাপত্তা প্রহরীর গুলিতে নির্মমভাবে শহীদ হন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ১৭ নম্বর আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হক। তাঁর হত্যাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভে ফেটে পড়ে বাঙালি জনতা। লৌহমানব আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে শুরু হয় গণআন্দোলন। এই হত্যার প্রতিবাদ ও ১১ দফা নিয়ে পরদিন ১৬ ফেব্রুয়ারি দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতাল শুরু করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। হরতালে নির্লজ্জ সামরিক জান্তার লেলিয়ে দেয়া পুলিশ গুলিবর্ষণ করে। এই গুলিবর্ষণের ঘটনায় ১৭ ফেব্রুয়ারিও সারা দেশ ছিলো ক্ষোভে উত্তাল। বিক্ষোভে ফেটে পড়েন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। ১৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সামনে দলবেঁধে জড়ো হতে থাকেন তারা। নাটোর-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে শুরু হয়ে আন্দোলন। এই আন্দোলন দমাতে সেদিন পুলিশ, ইপিআরের সাথে ছিলো রাইফেল সজ্জিত সেনাসদস্যরা।

উত্তেজিত শিক্ষার্থীদের সাথে সেনাসদস্যদের বাগবিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে সৃষ্টি হয় উত্তপ্ত পরিস্থিতি। ড. জোহা শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে দু’পক্ষের ক্রমাগত মধ্যস্থতার কূটনীতি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। সামরিক কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেটদের উদ্দেশ্যে করজোড়ে বারবার বলছিলেন, ‘প্লিজ ডোন্ট ফায়ার, প্লিজ ডোন্ট ফায়ার।’ ১১টার দিকে হুট করেই কাছ থেকে তাকে গুলি করে এক সেনা কর্মকর্তা। এরপর বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে রক্তাক্ত করা হয় তার দেহকে। বেলা দেড়টা নাগাদ রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন সবার প্রিয় জোহা স্যার। শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে গিয়ে শহীদ হয়ে যান তিনি।

এর আগের দিন ১৭ ফেব্রুয়ারি রক্তে সিক্ত নিজের ১০-১২ জন আহত ছাত্রকে দেখতে বোয়ালিয়া থানায় সেদিন ছুটে গিয়েছিলেন ড. জোহা। ছাত্রদের হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসার প্রাথমিক ব্যবস্থা করে দেন তিনি। সন্ধ্যায় সবার সামনে ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত নিজের শার্ট দেখিয়ে আবেগতাড়িত দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন, ‘আহত ছাত্রদের পবিত্র রক্তের স্পর্শে আমি উজ্জীবিত। এরপর আর যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুলি হয়, সেই গুলি কোনো ছাত্রের গায়ে লাগার আগে আমার বুকে বিঁধবে।’ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন পরদিন দেখতে যাওয়ার। কথা রেখে পরদিন এসেছিলেন বটে, তবে রক্তাক্ত ও নিথর দেহে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রশাসনিক ভবনের সামনে তাঁকে দাফন করা হয়। মূল ফটক দিয়ে ঢুকতেই দেখা মিলবে বিশাল এক চত্বরের মাঝে তার সমাধি। সবুজে ঘেরা ঘাসের মাঝে টাইলস বসানো একটি কবর। বিভিন্ন ফুল গাছের সৌরভে সেখানেই ঘুমিয়ে আছেন এ মহামানব।

দেশের প্রথম শহীদ এই বুদ্ধিজীবী ১৯৩৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বেড়ে ওঠা ও প্রাথমিক শিক্ষাও সেখানেই। দেশভাগের বছর তিনেক পর দাঙ্গার শিকার হয়ে সপরিবারে তিনি পূর্ব পাকিস্তানে আসেন। ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ড. জোহা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ভালো ফলাফল নিয়ে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষে উচ্চশিক্ষার্থে বিলাতও গিয়েছিলেন। লন্ডনের বিখ্যাত ইম্পেরিয়াল কলেজে রসায়নে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি করেছিলেন তিনি। উচ্চশিক্ষা চলাকালেই ১৯৬১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। ১৯৬৫-৬৭ সাল পর্যন্ত পালন করেন রাবির শাহ মখদুম হলের আবাসিক শিক্ষকের দায়িত্ব। এরপর ১৯৬৮ সালের পয়লা মে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন ড. জোহা।

দেশের প্রতি তাঁর এই ঋণ স্মরণে রাখতে রাবির শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালার গ্যালারিতে সংরক্ষণ করা হয়েছে তাঁর রক্তমাখা ছেঁড়া শার্ট, গুলিবিদ্ধ ছবি ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র। প্রধান ফটকের সামনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার সেই স্থানটিও সংরক্ষণ করা হয়েছে শ্রদ্ধা ভরে। তাঁর নামে নির্মাণ করা হয়েছে শহীদ ড. শামসুজ্জোহা হল। হলের প্রবেশ দ্বারের সামনে তার স্মরণে তৈরি করা হয়েছে ভাস্কর্য ‘স্ফুলিঙ্গ’। ২০০৮ সাল থেকে তার প্রয়াণ দিবসটিকে রাবিতে পালন করা হয় জোহা দিবস হিসেবে। সে বছরই মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন এই মহাত্মা।

নিজের ছাত্রদের জন্য রক্ত দেয়ার এই ঘটনা শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা। এমন শিক্ষকের দ্বিতীয় উদাহরণ খুঁজতে গেলে বেগ পেতে হবে স্বয়ং ইতিহাসকেও। বিশেষ করে পুরো শিক্ষক জাতির জন্যই তিনি অঢেল গৌরব ও অপরিমেয় অনুপ্রেরণার আধার। এই মহাপ্রাণ শিক্ষকের অবিস্মরণীয় আত্মত্যাগের কথা এ জাতি কখনো ভুলবে না। বরেণ্য এই বুদ্ধিজীবী উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে থাকবেন সবার মাঝে।

ষাট গম্বুজ বার্তা
ষাট গম্বুজ বার্তা